এগারোই সেপ্টেম্বরের সেই দিনটার কথা।

এগারোই সেপ্টেম্বরের সেই দিনটার কথা। নিউ ইয়র্কে নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা। প্রকৃত সত্য।

নিউ ইয়র্কে নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা।
_________________________________________________

আমেরিকার জীবনের এক মর্মান্তিক অভিজ্ঞতার গল্প আপনাদের শোনাতে চাই। তার কারণ, দুহাজার এক সালের এগারোই সেপ্টেম্বর নিয়ে অনেক কিছু বলা হয়েছে, অনেক সিনেমা আর নাটক নভেল হয়েছে, আর বাঙালির ঘরে ঘরে বাঙালির বৈশিষ্ট্যমূলক গাঁজার আড্ডাও অনেক হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত সত্য কতটা মানুষ জানতে পেরেছে, তা সন্দেহের বিষয়।

সেদিনটা ছিল মঙ্গলবার। আমার মেয়ে ঠিক তার আগের সপ্তাহে নিউ ইয়র্কের পাবলিক স্কুলে ভর্তি হবার একটা পরীক্ষায় পাশ করে এখানকার স্টাইভেসান্ট হাই স্কুলে ভর্তি হয়েছে। এই পরীক্ষায় পাশ ছিল আমাদের মতো সাধারণ মানুষদের কাছে মরণবাঁচন।

আমি তখন কাজ করি নিউ জার্সিতে, আমাদের ব্রুকলিন থেকে আড়াই ঘন্টা ড্রাইভ করে। নটার সময়ে অফিস পৌঁছোনোর একটু পরেই খবর পেলাম। প্রথমে কেউ ভালো বুঝতে পারেনি। কিন্তু তারপর, আসল খবর টিভিতে আসতে আরম্ভ করলো। টুইন টাওয়ারের একটা টাওয়ার তখন ভেঙে পড়েছে। মানুষ ভয়ে দিশেহারা।

হঠাৎ মনে হলো, আচ্ছা, আমাদের মেয়েটা এখন কোথায়? স্টাইভেসান্ট হাই স্কুল তো ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার থেকে ঢিলছোঁড়া দূরত্বে! এই ধরুণ, ক্যাথিড্রাল চার্চ থেকে রবীন্দ্র সদন।

যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। নটা থেকে দশটা, এগারোটা, … বাড়িতে স্ত্রীকে ফোন করলাম। সেও উদভ্রান্ত। কেউ কিছু বলতে পারছেনা। সেল ফোন কাজ করছেনা। ইতিমধ্যে দ্বিতীয় টাওয়ার ভেঙে পড়ে ধুলোর মতো গুঁড়িয়ে গেছে। টিভিতে দেখাচ্ছে বারবার।

আমার এক বন্ধুকে ম্যানহাটানে ইমেল করলাম। এবিসি টিভির অফিস। ওখানে কাজ করতাম আগে। “ভাই তুমি একটু খোঁজ নেবে কী ব্যাপার? মেয়েটার কোনো খবর পাচ্ছিনা।” জানতাম, ছেলেটা কিছু একটা করবে। ও খোঁজ করেওছিলো। কিন্তু সেখানে তখন যাওয়া অসম্ভব। আমাকে জানালো, “পার্থ, চিন্তা কোরোনা। সব ঠিক আছে মনে হয়।”

মনে হয়!!

বারোটার সময়ে টিভিতেই খবর দিলো, স্টাইভেসান্ট হাই স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা সবাই নিরাপদে আছে। কিন্তু, কোথায় আছে তারা? কেউ জানেনা। সেল ফোন কাজ করছেনা। কোনো ইমেলও আসছেনা মেয়ের কাছ থেকে।

ওই দিনটার অনেক গল্প আমি জানি। গল্প নয়। সত্যি কথা। নিজের জীবনের গল্প। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের একেবারে ওপরে ১০৮ তলায় ছিল উইন্ডোজ অফ দ্য ওয়ার্ল্ড নামে একটা রেস্টুরেন্ট। সেখানে অনেক বাংলাদেশী মুসলমান কাজ করতো। আমাদের চেনাও দু একজন ছিল সেখানে। তারা আর ফিরে আসেনি।

আমার পরিচিত অনেকেই শেষ হয়ে গেছে সেদিন। বড় বোনের মতো এক মহিলা এ্যাডেল ওয়েলটি। তাঁর ছেলে টিমোথি ফায়ারফাইটার ছিল। সেদিন ভুল তথ্যের ভিত্তিতে ভেঙে পড়া সেকেণ্ড টাওয়ারে ওদের পাঠানো হয়েছিল। পাঠিয়েছিল শাসকশ্রেণী। টিমোথির দেহাবশেষ আর পাওয়া যায়নি।

ইমিগ্রেন্ট অধিকারের তৃণমূল সংগঠক হিসেবে কাজ করার সময়ে পরিচয় হয়েছিল এক কৃষ্ণাঙ্গিনীর সঙ্গে। তিনি থাকতেন গ্রাউন্ড জিরো এলাকার একটা ফ্ল্যাটে। তাঁদের বলা হয়েছিল বাড়ি ছাড়তে হবেনা। সব ঠিক আছে। শাসকশ্রেণী বলেছিলো। লরা এক বছরের মধ্যেই ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন। পাঁচ বছর লড়াই করেছিলেন। তারপর আর পারেননি।

রাত এগারোটার সময়ে আমাদের মেয়ে বাড়ি ফিরে এসেছিলো। যেহেতু ওদের সেই বিখ্যাত স্কুলেও কোনো ইভাকুয়েশন প্ল্যান ছিলোনা, এবং স্কুলের মধ্যে ট্রিয়াজ স্টেশন তৈরী করা হয়েছিল — অর্থাৎ মৃত অথবা অর্ধমৃত মানুষদের নিয়ে এসে রাখা হচ্ছিল সেখানে — তাই ছাত্রছাত্রীদের বলা হয়েছিল তোমরা জাস্ট স্কুল থেকে বেরিয়ে গিয়ে উত্তর দিকে হাঁটতে থাকো। প্রায় দেড় হাজার ছাত্রছাত্রী ছোট ছোট দল বেঁধে হাঁটতে শুরু করেছিল। এভাবে তিন চার মাইল হাঁটার পর মেয়ের দল পৌঁছেছিল এক বান্ধবীর মায়ের অফিসে। সেখানে সারাদিন কাটিয়ে তারপর বাড়ি ফেরা। কিন্তু ফেরার উপায় নেই। ম্যানহাটান থেকে ব্রুকলিন আসবার সমস্ত ব্রিজ বন্ধ।

রাত আটটায় ওদিকে গাড়ি রেখে আবার হাঁটা। আবার তিন কি চার মাইল। অনেক রাতে ধুলো ও ছাই সর্বাঙ্গে মাখা কন্যাকে ফিরে পেলাম। এই হলো আমাদের নিজেদের ৯/১১’এর গল্প।

**********

আর একটু বাকি আছে। সারা পৃথিবীর চোখে “সবকিছু ব্যাক টু নরমাল” বার্তা পৌঁছে দেবার জন্যে শাসকশ্রেণী দু তিন সপ্তাহ পরেই স্টাইভেসান্ট হাই স্কুল আবার খুলে দিয়েছিলো। তখনও গ্রাউন্ড জিরোতে আগুন জ্বলছে। বাতাস বিষাক্ত পদার্থে ও ধোঁয়াতে ভারী। ফ্রি অ্যাসবেসটস আকাশে অসংখ্য। কিন্তু বিখ্যাত দুই প্রতিষ্ঠান — নিউ ইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জ এবং স্টাইভেসান্ট হাই স্কুল — খুলে দেওয়া হলো। বাকি সমস্ত স্কুল কলেজ দোকান বাজার প্রতিষ্ঠান সেখানে তখন বন্ধ।

শুধু তাই নয়, সস্তায় হবে বলে চূর্ণবিচূর্ণ টুইন টাওয়ার্স থেকে নিয়ে আসা সমস্ত লোহা লক্কড় আরও হাজার গার্বেজ নিউ ইয়র্ক সরকার স্টাইভেসান্ট হাই স্কুলের ঠিক পাশেই বজরার ডকে বোঝাই করতে শুরু করলো — স্কুল চলাকালীনই। সে গার্বেজ বিক্রি করা হয়েছিল ভারত এবং আরো কতগুলো তৃতীয় বিশ্বের দেশে।

আমরা স্টাইভেসান্ট হাই স্কুল পেরেন্ট এসোসিয়েশন রাস্তায় নেমে সপ্তাহের পর সপ্তাহ প্রতিবাদ প্রতিরোধ মিছিল ও সমাবেশ করেছিলাম। মিডিয়াতেও আমাদের কথা বহুবার বলা হয়েছে। কিন্তু শাসকশ্রেণী কর্ণপাতও করেনি। তখন নিউ ইয়র্কে মেয়র ট্রাম্পের এখনকার আইনজীবী রুডি জুলিয়ানি।

আমাদের মেয়ে এখনো ভালো আছে। সুস্থ আছে। কিন্তু অনেকে নেই। তীব্র মানসিক অবসাদের শিকার হয়েছে ওর অনেক বন্ধু ও বান্ধবী। স্কুল ছেড়ে দিয়ে চলে গেছে কেউ কেউ। কয়েকজন নিউ ইয়র্ক ছেড়েই চলে গেছে। এরা সবাই স্কুলের জানলা থেকে দেখেছিলো, টুইন টাওয়ার্স থেকে লোকেরা ঝাঁপিয়ে পড়ছে নিচে।

যারা সিগারেট খেতো, তাদের মধ্যে ক্যান্সারের সম্ভাবনা আছে বলে বিজ্ঞানীরা মন্তব্য করেছেন।

অনেক পরে, অনেক ধর্ণা, মিছিল, কনফারেন্স, কংগ্রেস সদস্যদের সঙ্গে মিটিংয়ের পর নিউ ইয়র্কের ওই এলাকায় যারা বসবাস করতো, কাজ করতো, ব্যবসা করতো, বা স্কুল কলেজ করতো — তাদের জন্যে গ্রাউন্ড জিরো হেলথ ফান্ড তৈরী করেছে মার্কিন সরকার। কারণ, কয়েক শো নিরীহ মানুষ নানারকম মারণরোগের শিকার হয়েছে। অনেকে মারা গেছে। অনেক ফায়ারফাইটার মারা গেছে পরে — ওই টিম ওয়েলটির মতোই। বহু রেসকিউ ডগ মারা গেছে।

তাদের হিসেব আছে তাও। হিসেবের মধ্যে নেই আরো কয়েক হাজার। তারা পরিচয়হীন মেক্সিকান ইমিগ্রেন্ট শ্রমিক। তাদের কাজে লাগানো হয়েছিল গ্রাউন্ড জিরো পরিষ্কারের কাজে। তারপর তারা হারিয়ে গেছে। কেউ তাদের খোঁজ রাখেনা।

আমরাও রাখিনি।

____________________

নিউ ইয়র্ক

১১ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯

Photo Courtesy: Creative Commons (for non-profit, educational use only)