আবরার ফাহাদ হত্যা — দুই দেশে নতুন ঘৃণা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি বন্ধ করুন

Bangladesh student Abrar Fahad wrote a post on Facebook, opposing a deal with India. Next day, ruling party Awami League’s student members went to his student residence, and brutally beat him to death. The aftermath has created enormous anti-India sentiment, and extremist forces found new oxygen from this incident. Immediate result would be backlash from fascist forces in India, who spare no opportunity to create hatred against Muslims of Bangladesh.

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শেরেবাংলা হলে বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যার ঘটনায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে আটকদের মধ্যে অনেকেই ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত। ভারতের সঙ্গে চুক্তির বিরোধিতা করে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন ফাহাদ। এর জের ধরে শেরেবাংলা হলের নিজের কক্ষ থেকে তাকে ডেকে নিয়ে বেধড়ক পেটানো হয়। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

আবরারের হত্যা নিয়ে বাংলাদেশে ঝড় বয়ে যাচ্ছে, এবং আমরা দূর থেকে তার আসন্ন পরিণতি দেখে ভয়ে শিউরে উঠছি।

ধর্মান্ধ, উগ্রপন্থী, ফ্যাসিস্ট ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি এই ঘটনায় নতুন করে অক্সিজেন পেলো, একথা বলে দেওয়ার অপেক্ষা রাখেনা। এর বিশ্লেষণ করা আজ জরুরি।

একজন মানবাধিকার কর্মী হিসেবে আমি আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে তীব্র ধিক্কার জানাচ্ছি, এবং সমস্ত পাঠক, পাঠিকা ও বন্ধুদের আহ্বান জানাচ্ছি তাঁরা যেন এই ঘটনার বিরুদ্ধে সোচ্চার হন।

সবাই জানে আমার বাংলাদেশ প্রীতি। বাংলাদেশের সমর্থনে আমি চিরকাল কথা বলে আসছি, এবং ভবিষ্যতেও বলে যাবো। ভারতের হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্টরা চাইছে বাংলাদেশ যেন দুর্বল হয়ে পড়ে। তারা হিন্দু-মুসলিম ঘৃণা ও বিভেদের আগুন ছড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসতে চায়। ইতিহাসের চাকা ঘুরিয়ে দিতে চায়। বাংলাদেশেও তাদের মিত্রশক্তি আছে — যারা বাংলাদেশের সম্পর্কে প্রতিনিয়ত বিদেশে কুৎসা রটায়। আর আছে রাজাকারবাহিনী ও তাদের প্রকাশ্য ও গোপন নানা শক্তি — যারা সুযোগ খুঁজছে বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার। এই হত্যাকান্ড তাদের হাতে নতুন অস্ত্র তুলে দিয়েছে।

আবরার ফাহাদ মেধাবী ছাত্র ছিল। সে ভারতের সঙ্গে চুক্তির বিরোধিতা করেছিল। তার জন্যে তার বাক-স্বাধীনতা এবং প্রাণ কেড়ে নিলো — ভেবে দেখুন — শেখ মুজিবের জন্মশতবর্ষ পালনের ঠিক একটু আগেই, তাঁরই হাতে গড়া আওয়ামী লীগের ছাত্রলীগ। আসলে, দীর্ঘদিন ধরে বিরোধীশূণ্য রাজনীতির সুযোগ নিয়ে মাফিয়া রাজনীতি বাংলাদেশে জাঁকিয়ে বসেছে। যে কোনো গণতন্ত্রে যদি বিরোধিতা না থাকে, তাহলে তা ক্রমে ক্রমে ফ্যাসিবাদে রূপান্তরিত হয়।

ভারতে এখন বিজেপি ও হিন্দুত্ববাদী আরএসএস রাজনীতির বিরোধিতা করার জন্যে সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতন বেড়ে চলেছে। এমনকি, যা কখনো স্বপ্নেও ভাবা যায়নি, বিখ্যাত বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ, শিল্পী ও কবিদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা আনা হয়েছে। ঠিক যেভাবে হিটলার ও মুসোলিনি ক্ষমতায় এসেছিলো, বা আজকের পৃথিবীতে ট্রাম্প বা বরিস জনসন অথবা ব্রাজিলের বলসেনারো যা করতে চায়, ভারতে তা শুরু হয়ে গেছে।

প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশও কি সেই পথেই যাবে?

আমার সতীর্থ অভিজিৎ রায়ের খুনের পর আরএসএস ও বিজেপি জলঘোলা করার চেষ্টা করেছিল। অভিজিৎ খুন হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ইসলামি জঙ্গিদের হাতে। এখন আবরার ফাহাদ খুন হলো তথাকথিত লিবারাল আওয়ামী লীগের ছাত্র ফ্রন্টের হাতে। এই সমস্ত ঘটনাতেই একদিকে হিন্দু ও ইসলামী মৌলবাদীরা, আর অন্যদিকে বিজেপি ও বিএনপির মতো প্রতিক্রিয়াশীল ও চরম দক্ষিণপন্থী শক্তি — যারা হিন্দু ও ইসলাম ধর্মকে রাজনীতির কাজে ব্যবহার করে ক্ষমতায় এসেছে ও আসতে চায়, তারা আরো শক্তিশালী হবে। এবং বাংলায় ফ্যাসিবাদ ঘাঁটি গেড়ে বসবে।

**যে দাবানলের মতো ভারতবিদ্বেষী আগুন জ্বলে উঠেছে আবরার হত্যার পরে, শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকার যদি প্রকৃত খোলামনে তার মোকাবিলা না করেন, এবং এইসব খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা না করেন, তাহলে পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাবে। **

ভারতের ফ্যাসিস্ট ও ধর্মান্ধরা সুযোগ খুঁজছে বাংলাকে দখল করবার। তসলিমা নাসরীন ও তাঁর বই “লজ্জা”কে নিয়েও তারা রাজনীতি করেছে। বাংলাদেশ থেকে আসা ইমিগ্রেন্ট ও শরণার্থী নিয়ে তারা রাজনীতির খেলা খেলছে, এবং ভবিষ্যতে নাগরিকপঞ্জী এনআরসি (NRC)’র প্যাঁচে মুসলমানদের ফেলে তারা বাংলায় ভোট রাজনীতি করবে, একথা এখন আমরা সবাই জানি। বাংলাদেশ এখন বিজেপির হাতের তুরুপের তাস, ঠিক যেমন কাশ্মীরকে এবং ঝাঁকিয়ে তোলা উগ্র দেশপ্রেমকে তুরুপের তাস হিসেবে কাজে লাগিয়ে তারা লোকসভা নির্বাচনে জিতেছে।

যাদের হাতে দেশের অর্থনীতি বিপর্যস্ত, সাধারণ মানুষ বিপন্ন, জলবায়ু বিপন্ন, নারীস্বাধীনতা বিপন্ন, সংখ্যালঘুদের অধিকার ভুলুন্ঠিত — মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্যে কাশ্মীর, বাংলাদেশ, গোমাংস, রামমন্দির — এসবই তাদের একমাত্র মূলধন। তারা সে ক্যাপিটাল কাজে লাগাবেই। গোয়েবলস মিডিয়াও তাদের সঙ্গে আছে। যারা প্রতিনিয়ত শাসকের স্বপক্ষে প্রোপাগাণ্ডা চালিয়ে যাচ্ছে।

তারা চায়, আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ডের সুযোগে ক্যাম্পাস ছাত্র রাজনীতি যেন বন্ধ করে দেওয়া যায়। তারা ভাষা আন্দোলন বা মুক্তিযুদ্ধে ছাত্র রাজনীতির ভূমিকা অস্বীকার করতে চায়, এবং মানুষের মন থেকে মুছে ফেলতে চায়। তাদের পিছনে আছে কিছু তথাকথিত পাকিস্তানপন্থী, জামাতের সাথে গা শোঁকাশুঁকি করা বুদ্ধিজীবী। তারা ইতিহাসের বিকৃতকরণ করবে। ঠিক যেমন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিজেপি ও তার সমর্থক মিডিয়া দাবি তুলেছে, যাদবপুরে ছাত্র রাজনীতিকে গলা টিপে মারতেই হবে।

যে কোনো বিরোধিতাকে শেষ করে দিতেই হবে।

দুই দেশে একই খেলা। আবার বলছি, ঠিক এইভাবেই হিটলার ও মুসোলিনি ক্ষমতায় এসেছিলো। ফ্যাসিবাদ ও নাৎসিবাদ কায়েম হয়েছিল। ত্রাসের রাজত্ব বয়ে গিয়েছিলো। সারা পৃথিবীতে লক্ষ লক্ষ নিরীহ মানুষের রক্ত ঝরেছিল। আবার সেই ঘটনা ঘটতে চলেছে।

যদি আপনারা এই অশুভ শক্তিগুলোকে প্রতিহত করতে চান, তাহলে দলমতনির্বিশেষে এইসব খুন ও স্বাধীন মতপ্রকাশের কণ্ঠরোধ করার হিংস্র রাজনীতির তীব্র প্রতিবাদ করুন। পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের মানুষকে বুঝতে হবে, ফ্যাসিবাদ ও ধর্মান্ধতার আসল লক্ষ্য হলো বাঙালি জাতিকে, এবং তার ভাষা, ইতিহাস, সংগীত, কাব্য, সংস্কৃতিকে চিরতরে ধ্বংস করে ফেলা। এবং অর্থ, সমাজ ও ক্ষমতার নিরঙ্কুশ দখল।

আজকে ফ্যাসিবাদ ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ আমাদের দুই বাংলার মানুষের কাছে এক নতুন মুক্তিযুদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত হোক, এই আমার প্রার্থনা।

সবাইকে বিজয়া দশমীর শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা জানাই।

এগারোই সেপ্টেম্বরের সেই দিনটার কথা।

এগারোই সেপ্টেম্বরের সেই দিনটার কথা। নিউ ইয়র্কে নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা। প্রকৃত সত্য।

নিউ ইয়র্কে নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা।
_________________________________________________

আমেরিকার জীবনের এক মর্মান্তিক অভিজ্ঞতার গল্প আপনাদের শোনাতে চাই। তার কারণ, দুহাজার এক সালের এগারোই সেপ্টেম্বর নিয়ে অনেক কিছু বলা হয়েছে, অনেক সিনেমা আর নাটক নভেল হয়েছে, আর বাঙালির ঘরে ঘরে বাঙালির বৈশিষ্ট্যমূলক গাঁজার আড্ডাও অনেক হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত সত্য কতটা মানুষ জানতে পেরেছে, তা সন্দেহের বিষয়।

সেদিনটা ছিল মঙ্গলবার। আমার মেয়ে ঠিক তার আগের সপ্তাহে নিউ ইয়র্কের পাবলিক স্কুলে ভর্তি হবার একটা পরীক্ষায় পাশ করে এখানকার স্টাইভেসান্ট হাই স্কুলে ভর্তি হয়েছে। এই পরীক্ষায় পাশ ছিল আমাদের মতো সাধারণ মানুষদের কাছে মরণবাঁচন।

আমি তখন কাজ করি নিউ জার্সিতে, আমাদের ব্রুকলিন থেকে আড়াই ঘন্টা ড্রাইভ করে। নটার সময়ে অফিস পৌঁছোনোর একটু পরেই খবর পেলাম। প্রথমে কেউ ভালো বুঝতে পারেনি। কিন্তু তারপর, আসল খবর টিভিতে আসতে আরম্ভ করলো। টুইন টাওয়ারের একটা টাওয়ার তখন ভেঙে পড়েছে। মানুষ ভয়ে দিশেহারা।

হঠাৎ মনে হলো, আচ্ছা, আমাদের মেয়েটা এখন কোথায়? স্টাইভেসান্ট হাই স্কুল তো ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার থেকে ঢিলছোঁড়া দূরত্বে! এই ধরুণ, ক্যাথিড্রাল চার্চ থেকে রবীন্দ্র সদন।

যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। নটা থেকে দশটা, এগারোটা, … বাড়িতে স্ত্রীকে ফোন করলাম। সেও উদভ্রান্ত। কেউ কিছু বলতে পারছেনা। সেল ফোন কাজ করছেনা। ইতিমধ্যে দ্বিতীয় টাওয়ার ভেঙে পড়ে ধুলোর মতো গুঁড়িয়ে গেছে। টিভিতে দেখাচ্ছে বারবার।

আমার এক বন্ধুকে ম্যানহাটানে ইমেল করলাম। এবিসি টিভির অফিস। ওখানে কাজ করতাম আগে। “ভাই তুমি একটু খোঁজ নেবে কী ব্যাপার? মেয়েটার কোনো খবর পাচ্ছিনা।” জানতাম, ছেলেটা কিছু একটা করবে। ও খোঁজ করেওছিলো। কিন্তু সেখানে তখন যাওয়া অসম্ভব। আমাকে জানালো, “পার্থ, চিন্তা কোরোনা। সব ঠিক আছে মনে হয়।”

মনে হয়!!

বারোটার সময়ে টিভিতেই খবর দিলো, স্টাইভেসান্ট হাই স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা সবাই নিরাপদে আছে। কিন্তু, কোথায় আছে তারা? কেউ জানেনা। সেল ফোন কাজ করছেনা। কোনো ইমেলও আসছেনা মেয়ের কাছ থেকে।

ওই দিনটার অনেক গল্প আমি জানি। গল্প নয়। সত্যি কথা। নিজের জীবনের গল্প। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের একেবারে ওপরে ১০৮ তলায় ছিল উইন্ডোজ অফ দ্য ওয়ার্ল্ড নামে একটা রেস্টুরেন্ট। সেখানে অনেক বাংলাদেশী মুসলমান কাজ করতো। আমাদের চেনাও দু একজন ছিল সেখানে। তারা আর ফিরে আসেনি।

আমার পরিচিত অনেকেই শেষ হয়ে গেছে সেদিন। বড় বোনের মতো এক মহিলা এ্যাডেল ওয়েলটি। তাঁর ছেলে টিমোথি ফায়ারফাইটার ছিল। সেদিন ভুল তথ্যের ভিত্তিতে ভেঙে পড়া সেকেণ্ড টাওয়ারে ওদের পাঠানো হয়েছিল। পাঠিয়েছিল শাসকশ্রেণী। টিমোথির দেহাবশেষ আর পাওয়া যায়নি।

ইমিগ্রেন্ট অধিকারের তৃণমূল সংগঠক হিসেবে কাজ করার সময়ে পরিচয় হয়েছিল এক কৃষ্ণাঙ্গিনীর সঙ্গে। তিনি থাকতেন গ্রাউন্ড জিরো এলাকার একটা ফ্ল্যাটে। তাঁদের বলা হয়েছিল বাড়ি ছাড়তে হবেনা। সব ঠিক আছে। শাসকশ্রেণী বলেছিলো। লরা এক বছরের মধ্যেই ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন। পাঁচ বছর লড়াই করেছিলেন। তারপর আর পারেননি।

রাত এগারোটার সময়ে আমাদের মেয়ে বাড়ি ফিরে এসেছিলো। যেহেতু ওদের সেই বিখ্যাত স্কুলেও কোনো ইভাকুয়েশন প্ল্যান ছিলোনা, এবং স্কুলের মধ্যে ট্রিয়াজ স্টেশন তৈরী করা হয়েছিল — অর্থাৎ মৃত অথবা অর্ধমৃত মানুষদের নিয়ে এসে রাখা হচ্ছিল সেখানে — তাই ছাত্রছাত্রীদের বলা হয়েছিল তোমরা জাস্ট স্কুল থেকে বেরিয়ে গিয়ে উত্তর দিকে হাঁটতে থাকো। প্রায় দেড় হাজার ছাত্রছাত্রী ছোট ছোট দল বেঁধে হাঁটতে শুরু করেছিল। এভাবে তিন চার মাইল হাঁটার পর মেয়ের দল পৌঁছেছিল এক বান্ধবীর মায়ের অফিসে। সেখানে সারাদিন কাটিয়ে তারপর বাড়ি ফেরা। কিন্তু ফেরার উপায় নেই। ম্যানহাটান থেকে ব্রুকলিন আসবার সমস্ত ব্রিজ বন্ধ।

রাত আটটায় ওদিকে গাড়ি রেখে আবার হাঁটা। আবার তিন কি চার মাইল। অনেক রাতে ধুলো ও ছাই সর্বাঙ্গে মাখা কন্যাকে ফিরে পেলাম। এই হলো আমাদের নিজেদের ৯/১১’এর গল্প।

**********

আর একটু বাকি আছে। সারা পৃথিবীর চোখে “সবকিছু ব্যাক টু নরমাল” বার্তা পৌঁছে দেবার জন্যে শাসকশ্রেণী দু তিন সপ্তাহ পরেই স্টাইভেসান্ট হাই স্কুল আবার খুলে দিয়েছিলো। তখনও গ্রাউন্ড জিরোতে আগুন জ্বলছে। বাতাস বিষাক্ত পদার্থে ও ধোঁয়াতে ভারী। ফ্রি অ্যাসবেসটস আকাশে অসংখ্য। কিন্তু বিখ্যাত দুই প্রতিষ্ঠান — নিউ ইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জ এবং স্টাইভেসান্ট হাই স্কুল — খুলে দেওয়া হলো। বাকি সমস্ত স্কুল কলেজ দোকান বাজার প্রতিষ্ঠান সেখানে তখন বন্ধ।

শুধু তাই নয়, সস্তায় হবে বলে চূর্ণবিচূর্ণ টুইন টাওয়ার্স থেকে নিয়ে আসা সমস্ত লোহা লক্কড় আরও হাজার গার্বেজ নিউ ইয়র্ক সরকার স্টাইভেসান্ট হাই স্কুলের ঠিক পাশেই বজরার ডকে বোঝাই করতে শুরু করলো — স্কুল চলাকালীনই। সে গার্বেজ বিক্রি করা হয়েছিল ভারত এবং আরো কতগুলো তৃতীয় বিশ্বের দেশে।

আমরা স্টাইভেসান্ট হাই স্কুল পেরেন্ট এসোসিয়েশন রাস্তায় নেমে সপ্তাহের পর সপ্তাহ প্রতিবাদ প্রতিরোধ মিছিল ও সমাবেশ করেছিলাম। মিডিয়াতেও আমাদের কথা বহুবার বলা হয়েছে। কিন্তু শাসকশ্রেণী কর্ণপাতও করেনি। তখন নিউ ইয়র্কে মেয়র ট্রাম্পের এখনকার আইনজীবী রুডি জুলিয়ানি।

আমাদের মেয়ে এখনো ভালো আছে। সুস্থ আছে। কিন্তু অনেকে নেই। তীব্র মানসিক অবসাদের শিকার হয়েছে ওর অনেক বন্ধু ও বান্ধবী। স্কুল ছেড়ে দিয়ে চলে গেছে কেউ কেউ। কয়েকজন নিউ ইয়র্ক ছেড়েই চলে গেছে। এরা সবাই স্কুলের জানলা থেকে দেখেছিলো, টুইন টাওয়ার্স থেকে লোকেরা ঝাঁপিয়ে পড়ছে নিচে।

যারা সিগারেট খেতো, তাদের মধ্যে ক্যান্সারের সম্ভাবনা আছে বলে বিজ্ঞানীরা মন্তব্য করেছেন।

অনেক পরে, অনেক ধর্ণা, মিছিল, কনফারেন্স, কংগ্রেস সদস্যদের সঙ্গে মিটিংয়ের পর নিউ ইয়র্কের ওই এলাকায় যারা বসবাস করতো, কাজ করতো, ব্যবসা করতো, বা স্কুল কলেজ করতো — তাদের জন্যে গ্রাউন্ড জিরো হেলথ ফান্ড তৈরী করেছে মার্কিন সরকার। কারণ, কয়েক শো নিরীহ মানুষ নানারকম মারণরোগের শিকার হয়েছে। অনেকে মারা গেছে। অনেক ফায়ারফাইটার মারা গেছে পরে — ওই টিম ওয়েলটির মতোই। বহু রেসকিউ ডগ মারা গেছে।

তাদের হিসেব আছে তাও। হিসেবের মধ্যে নেই আরো কয়েক হাজার। তারা পরিচয়হীন মেক্সিকান ইমিগ্রেন্ট শ্রমিক। তাদের কাজে লাগানো হয়েছিল গ্রাউন্ড জিরো পরিষ্কারের কাজে। তারপর তারা হারিয়ে গেছে। কেউ তাদের খোঁজ রাখেনা।

আমরাও রাখিনি।

____________________

নিউ ইয়র্ক

১১ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯

Photo Courtesy: Creative Commons (for non-profit, educational use only)