ধরা যাক, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হলো। পাকিস্তানে শত্রুকে গুঁড়িয়ে দিলাম আমরা। তারপর কী? কয়েকটা প্রশ্ন করা চলবে?

0
135


আমার বন্ধুরাই আমাকে পাকিস্তানী বলছে। দেশদ্রোহী বলছে। বলছে আমি নাকি দেশের এই সংকটে যুদ্ধের বিরুদ্ধে কথা বলে ভারতের শত্রুর মতো আচরণ করছি। আমি নাকি একজন “enemy within” বা ঘরের শত্রু। আমাদের মতো লোকদের আগে শায়েস্তা করা দরকার। 
তাই আমি ভেবে দেখলাম, আমি খুব অন্যায় করছি। এমন তো নয় যে আমি সবজান্তা, আর কেউ কিছু জানেনা। আমিই একমাত্র ইতিহাস পড়েছি, আর কেউ পড়েনি। আমিই একমাত্র খাঁটি দেশপ্রেমিক, আর সবাই ইডিয়েট। তাছাড়া, ভয়ও আছে, কে কোথায় রাস্তায় ধরে ধোলাই দেবে। কী দরকার?

তারপর ধরুন, প্রত্যেকের প্রতিই আমার শ্রদ্ধা আছে। আমি সম্মান দিতে জানি মানুষকে। সুতরাং, যুদ্ধের পক্ষে, পাকিস্তানের ভিতরে ঢুকে বোমা ফেলার বিজেপি সিদ্ধান্তের স্বপক্ষে আমি সম্পূর্ণ সহমত না হলেও, শুধুমাত্র তাদের দেশপ্রেমকে সম্মান জানানোর জন্যে — ধরা যাক, আমি আমার যুদ্ধবিরোধী অবস্থান আজকের জন্যে পরিবর্তন করলাম। হোক যুদ্ধ, হোক বোমাবর্ষণ। সন্ত্রাসীদের ঘাঁটিগুলো ভেঙে গুঁড়িয়ে দাও। জৈশ আর যারা যারা আছে, উড়িয়ে দাও তাদের সব কটাকে। 

পুলওয়ামার শহীদ সেনাদের জন্যে আমার যে কৃতজ্ঞতা, তা আমি আগেও লিখেছি। তাদের মৃত্যু যেন ব্যর্থ না হয়। রক্তের বদলে রক্ত চাই। ধরা যাক, ভালোই হবে। 

এসব প্রতিশোধ নেওয়া হয়ে গেলে, তারপরে আমি কতগুলো প্রশ্ন করতে পারি কি? আশাকরি, আমার ওই বন্ধুরা আমাকে সে সুযোগ দেবে। 

যদি দেয়, তাহলে আমি এই কথাগুলো বলবো। 

ওরা যদি উত্তর না দেয়, আপনারা দিন। বা, আমার থেকে যারা অনেক বেশি জানে, তাদের বলুন উত্তর দিতে। 

হাজার হোক, আমি সামান্য মানুষ। কীই বা জানি এসব বিশাল বিশাল ব্যাপারের?___________________________

প্রশ্ন ১ — ম্যাক্সিমাম সিকিউরিটি জোন, যেখানে মাছি গলেনা, সেখানে সন্ত্রাসীরা ট্রাক বোমা নিয়ে এসে পঁয়তাল্লিশ জন অস্ত্রধারী, ট্রেনিং নেওয়া সৈনিককে উড়িয়ে দিলো কী করে? তার কোনো নিরপেক্ষ তদন্ত হবে কি? কে দায়ী এই ভয়াবহ মৃত্যুর জন্যে, এই সৈনিকদের গণহত্যার জন্যে, তার সনাক্তকরণ হবে কি? 

প্রশ্ন ২ — এখনো পর্যন্ত এই বিশাল নিরাপত্তা গাফিলতির জন্যে কোনো জেনারেল, কর্ণেল, মন্ত্রী বা নিরাপত্তা অফিসার পদত্যাগ করেছে কি? কোনো ব্যাংকের ভল্টে  যদি ডাকাতি হয়, নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা অফিসার বা ব্যাংক ম্যানেজার যার কাছে সিকিউরিটির চাবিকাঠি থাকে, তার চাকরি যায়। কারণ তারা ডাকাতি বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছে। ব্যর্থতার দায়িত্ব কর্পোরেট জগতে নিতেই হয়। আর এখন তো সরকার চলছে কর্পোরেট আমেরিকার মডেলে। তাহলে, এখানে তা হবেনা কেন? 

প্রশ্ন ৩ — শুনেছি, আগেই নাকি খবর এসেছিলো, সন্ত্রাসী হামলা হতে চলেছে। তারপরেও নিরাপত্তায় এতো বড় গর্ত থেকে গেলো কীভাবে? কেউ বা কারা কি ইচ্ছাকৃতভাবে এই সন্ত্রাস যাতে হয়, তা সুনিশ্চিত করেছে? তারা কারা? তাদের খুঁজে বের করা কি এতই অসম্ভব?

প্রশ্ন ৪ — আচ্ছা, ধরা যাক, ভারতের মিলিটারি ও এয়ার ফোর্স পাকিস্তানে ঢুকে জঙ্গি ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দিলো। যদিও, আন্তর্জাতিক আইন বলেছে, একতরফাভাবে কোনো দেশের সীমারেখার মধ্যে ঢুকে বোমাবর্ষণ করা — কোনো আন্তর্জাতিক আলোচনা ছাড়াই — সে দেশের সার্বভৌমত্ব (sovereignty) ধ্বংস করে, যা আন্তর্জাতিক আইনবিরুদ্ধ কাজ। যাই হোক, আমেরিকা আমাদের শিখিয়েছে, কীভাবে সারা পৃথিবীর বিরোধিতার তোয়াক্কা না করে একতরফাভাবে যুদ্ধ, বোমাবর্ষণ ও গণহত্যা করা যায়। ইরাক, ভিয়েতনাম, এখন সিরিয়া। সুতরাং, নিশ্চয়ই করা যায়। ধরে নিলাম। তাহলে, মোদী ও তাঁরা সরকার আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে কি? তারা কি গ্যারান্টি দেবে, আর কখনো এ ধরণের সন্ত্রাসী হামলা হবেনা?

প্রশ্ন ৫ — গ্যারান্টি ছাড়া একটা গাড়িও যখন আমরা কিনিনা, এমনকি একটা সেলাই মেশিন, তাহলে গ্যারান্টি ছাড়া আমরা যুদ্ধ ও বোমাবর্ষণ ও তার পিছনে যে বিশাল অংকের অর্থব্যয়, তা কিনবো কী করে? এই কর্পোরেট সিস্টেমে নির্বাচন তো এখন বৃহত্তম মল, সুপারমার্কেট। 

প্রশ্ন ৬ — এই যুদ্ধের পরে কি কাশ্মীর সমস্যার স্থায়ী কোনো সমাধান খুঁজে বের করা হবে? আমেরিকা ও সৌদি আরব জাতীয় দেশগুলো — যারা পাকিস্তানকে চিরকাল অস্ত্র ও অর্থসাহায্য করে এসেছে, এবং আজকেও করছে (সৌদি ক্রাউন প্রিন্স গত সপ্তাহেই পাকিস্তানে ও ভারতে ভ্রমণ করেছেন, এবং বিশাল অর্থসাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন পাকিস্তানকে) — তাদের কি এই সমাধান আলোচনায় সামিল করা হবে? কারণ, কাশ্মীরের এই জটিলতা এবারে একেবারেই শেষ করা দরকার। 

প্রশ্ন ৭ — পাকিস্তানকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিলে কি সন্ত্রাস ও কাশ্মীর সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে? ধরা যাক, বিজেপি ও আর এস এস তো চিরকালই চেয়ে এসেছে পাকিস্তানের ধ্বংস। যদি তর্কের খাতিরে ধরে নিই, আমরা পাকিস্তানকে ধ্বংস করে দিলাম একেবারে। তাহলে কি পাকিস্তানী শিশু এবং কয়েক কোটি মানুষের সীমান্ত পার হয়ে ভারতে আসা বন্ধ হবে? তাদের প্রতিহিংসার ও প্রতিশোধের আগুন কি নিভে যাবে? অন্য দেশের সন্ত্রাসীরা কি তখন আরো বেশি করে ভারতের ওপর নানাভাবে সাবোটাজ ও সন্ত্রাসী হামলা চালাবে না? তার গ্যারান্টি কি মোদী ও আর এস এস সরকার দিতে পারবে?

প্রশ্ন ৮ — এই সমস্ত যুদ্ধ ও সন্ত্রাস দমনের কাজ শেষ হলে ভারতের অর্থনৈতিক সংকট, দুর্নীতি, জনবিস্ফোরণ, পরিবেশ ও জলবায়ু সংকট, ভয়াবহ কৃষি ও বেকার সমস্যা, রাফায়েল চক্রান্ত, নীরব মোদী-বিজয় মাল্য-আম্বানি জাতীয় অতি বিশাল মাপের দুর্নীতি ও স্ক্যাণ্ডাল মোদী সরকার কি মোকাবিলা করবে অনতিবিলম্বে? 

প্রশ্ন ৯ — যুদ্ধ ও সন্ত্রাস দমন হয়ে গেলে মোদী ও বিজেপি সরকার কি সরকারি ব্যাঙ্ক, শিল্প, ইন্স্যুরেন্স, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং পরিবহন — এসব সেক্টরকে সম্পূর্ণ বেসরকারিকরণ করে ফেলবে? এক ডলারে এখন ৭২ টাকা। এবারে কি তা আই এম এফ ও বিশ্ব ব্যাংকের নির্দেশে ৮০ বা ৮৫ টাকা হয়ে যাবে? জিনিসপত্রের দাম, তেলের দাম, পরিবহণ, মেডিকেল, শিক্ষা — এসবের খরচ কি আরো অনেক বেড়ে যাবে? 

প্রশ্ন ১০ — এবারের নির্বাচনে জয়লাভ করলে মোদী ও বিজেপি এবং আর এস এস কি ভারতের সংবিধানকে সম্পূর্ণভাবে বদলে ফেলবে, যাতে রাজনৈতিক বিরোধিতাকে প্রকাশ্যেই দেশদ্রোহিতা বলে ঘোষণা করা যায়, এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের দেশদ্রোহিতার দোষে সাংবিধানিকভাবে শাস্তি দেওয়া যায়?

উত্তরের অপেক্ষায় থাকবো। আপনাদের সকলকে উত্তর খুঁজে বের করার জন্যে প্রেরণা, উদ্দীপনা ও উৎসাহ দিতে থাকবো। 

ভারত মাতা কি জয়। জয় হিন্দ। বন্দে মাতরম। 
_________________
ব্রুকলিন, নিউ ইয়র্ক 
২৬শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ 

Join the Conversation

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.