রবীন্দ্রনাথ ও বাংলা ভাষার অবলুপ্তি।

0
239
The poet of all poets. The cultural identity of modern Bengal.

ফেব্রুয়ারি মাস ভাষা দিবসের মাস। বাংলা ভাষার সম্মান রক্ষার জন্যে যে শহীদরা প্রাণ দিয়েছেন, তাঁদের স্মরণ করবার মাস। ২১শে ফেব্রুয়ারির মাস। সেই উপলক্ষ্যেই এই বিশেষ রচনা।

এই তেত্রিশ বছর আমেরিকায় থাকার পরে বাংলা বর্ণমালা আমার মনে থেরাপির কাজ করে। আর পশ্চিমবাংলায়, কলকাতায় এখন বাংলা বর্ণমালা ঠিকমতো বলতে পারে, এমন ছেলেমেয়ের সংখ্যা হাতে গোণা যায়। বানান বা ব্যাকরণের কথা তো আর তুললামই না। সেটা একটা স্ক্যান্ডালে পরিণত হয়েছে এখন। কিন্তু, তার জন্যে নতুন প্রজন্মকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। আমরা তাদের শেখাইনি। বাংলা ভাষার প্রতি গর্ব অনুভব করিনি কখনো তেমন করে। বাংলা ভাষার হাজার বছরের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস আমরা তাদের পড়াইনি। এখন দুই বাংলাতেই দেখি, ভুল বানানে বাংলা লেখা হয়। এবং, সেসব লেখা সোশ্যাল মিডিয়াতে বাহবাও পায়।

আমি আগেও বলেছি, আবার বলছি। এবং ভবিষ্যতেও আবার বলবো। কুড়ি থেকে তিরিশ বছর পরে কলকাতায়, পশ্চিমবঙ্গে এবং ভারতে রবীন্দ্রনাথ আর কেউ পড়বে না। একটু ভুল বললাম, এখনই পড়েনা। আর মাত্র এক প্রজন্ম পরে রবীন্দ্রনাথের গান — ওই একশ্রেণীর এলিট বাঙালি ছাড়া –কেউ শুনবেনা। এবং, রবীন্দ্রনাথকে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির মন থেকে মুছে দেওয়া হবে। এবং, রবীন্দ্রনাথ মুছে গেলে কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক চরিত্রই চিরকালের মতো মুছে যাবে। বাংলা তখন “ইন্ডিয়া” হয়ে যাবে।

বাংলাদেশ বাংলা ভাষাকে, সংস্কৃতিকে ধরে রেখেছে। রাখবে। কিন্তু সংকট সেখানেও তীব্র। পয়লা বৈশাখ পালন করাকে ধর্মান্ধ ইসলামীরা তীব্র আক্রমণ করে যাচ্ছে। রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে একশ্রেণীর তথাকথিত ইন্টেলেকচুয়াল বিদ্বেষ ছড়িয়ে যাচ্ছেন প্রতিদিন নানা মাধ্যমে।

আমার কথা শুনে অনেকেই অবিশ্বাসের হাসি হাসবেন। অনেকে ব্যঙ্গবিদ্রূপ করবেন। অনেকে বলবেন, এতে ক্ষতি কী? ওই এক রবীন্দ্রনাথকে ধরে বসে থাকলে চলবে নাকি? আমাদের “এগিয়ে যেতে হবে।” এছাড়া অনেক বাঙালি বলবেন, তোমার কথা বিদেশে বসে বাস্তব অবস্থা না বুঝে বলা কথা। কুম্ভীরাশ্রু। তুমি দেশে আর থাকোনা, তাই বড় বড় কথা বলো। তোমার ফার্স্ট হ্যান্ড নলেজ নেই।

আমি এই প্রত্যেকটা কথার উত্তর বিশদভাবে দিতে পারি। বিতর্ক, আলোচনা করতে পারি। গত পঞ্চাশ বছরের — অর্থাৎ আমার সচেতন জীবনের — ইতিহাস ও অভিজ্ঞতা দিয়ে একটু একটু করে বিশ্লেষণ করে দেখিয়ে দিতে পারি। আগেও চেষ্টা করেছি। আপনারা যদি গুগল সার্চ করেন আমার নাম দিয়ে (অর্থাৎ পার্থ ব্যানার্জী বা পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়), আর তার সাথে কী ওয়ার্ড হিসেবে “রবীন্দ্রনাথ,” “টেগোর,” “Bengali culture,” “সাংস্কৃতিক সংকট,” “Bengali language” — এইগুলো ব্যবহার করে, তাহলেই আমার অসংখ্য লেখা, ব্লগ, ইউটিউবের ভিডিও, নানা কলেজ ও ইউনিভার্সিটিতে দেওয়া বক্তৃতা — সব পেয়ে যাবেন।

আমি আশা করিনা খুব বেশি লোকজন আমার কথা শুনে সেগুলো একটু ভালো করে দেখার চেষ্টা করবেন। কারণ, আসল সংকট হলো — ওই যেমন হীরক রাজার দেশের প্রোপাগান্ডা মন্ত্রী বলে গেছেন — “জানার কোনো শেষ নাই, জানার চেষ্টা বৃথা তাই।”

জানতে, শিখতে কেউ আর চায়না।

কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা, বিতর্ক, প্রশ্ন, চ্যালেঞ্জ — এসব এখন আউট অফ ফ্যাশন হয়ে গেছে। আমরা যখন নিতান্তই দারিদ্র্যের মধ্যে কলকাতায় বড় হয়েছিলাম, তখন কেউ কোনো ইন্টেলেকচুয়াল আলোচনা করলে আমরা অবাক বিস্ময়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকতাম। শরীরের মনের সব রোমকূপ দিয়ে শুষে নিতাম যা পারি। অনুপ্রাণিত হতাম। রোমাঞ্চিত হতাম সেই আলোচনার কথা ভেবে রাতে ঘুমের মধ্যে। বন্ধুরা সেই নিয়ে আড্ডা দিতাম।

আর এখন, যে কোনো গ্যাদারিং বা পার্টিতে কেউ কোনো সিরিয়াস বিষয় নিয়ে — অর্থাৎ বৌদ্ধিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করলে হয় লোকে সেখান থেকে সরে যায়, আর নয়তো প্রতি মুহূর্তে প্রমাণ করার চেষ্টা করে, যিনি আলোচনা করছেন, তিনি কত কম জানেন, এবং যিনি শুনছেন তাঁর যদিও কোনোই ইন্টেলেকচুয়াল এক্সপার্টিজ নেই, তিনি কত পন্ডিত।

বিচার, বিশ্লেষণ করলে, করার সাহস দেখালে উগ্র দেশপ্রেমিক জাতীয় “ঘাতক সৈন্যে ডাকি মারো মারো ওঠে হাঁকি” লোকজন তাকে “ইন্টেলেকচুয়াল, বুদ্ধিজীবী, আঁতেল” এসব বাক্যবাণে জর্জরিত করে। সোশ্যাল মিডিয়াতে তাকে আক্রমণ করা হয়। বেশির ভাগ সময়ে এই ভয় দেখানো, উপহাস করা ওই ব্যতিক্রমী মানুষদের চুপ করিয়ে দিতে সফল হয়। এই গেম প্ল্যানটা এখন খুব খেটে গেছে। এরকম অভিজ্ঞতা আমার অনেকবার হয়েছে। মনে হয়েছে, এতো কম জেনে মানুষ কী করে নিজেকে এতো সর্ববিদ্যাবিশারদ ভাবতে পারে?

আমি নিজেও যে বিশাল কোনো পণ্ডিত বা ইন্টেলেকচুয়াল তা নই। আমি চমস্কি নই, অরুন্ধতী রয় নই, এমনকি শশী থারুর নই। আমার পেডিগ্রি নেই। অর্থ নেই। রাজনৈতিক ব্যাকিং নেই। তাও, বহুকাল ধরে আমেরিকায় নানা ইউনিভার্সিটিতে পড়ে আর পড়িয়ে — এবং দেশের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রেখে — যে জ্ঞান ও অন্তর্দৃষ্টি অর্জন করেছি, তাও বড় কম নয়।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেসব দিয়ে যাবো কাকে? নেবার লোক নেই।

আমি জানি, বহু ভালো ভালো মানুষ রবীন্দ্রনাথ নিয়ে কাজ করছেন, ছাত্রছাত্রীদের গান শেখাচ্ছেন। অনেকে চলচ্চিত্র তৈরী করেছেন উঁচুমানের। আমার নিজের ফ্যামিলিতেই রবীন্দ্রনাথ নিয়ে পি এইচ ডি করেছে বা করছে — এমন দুজন আছে। তাদের কাজ থেকে যাবে। কিন্তু একচল্লিশে মহাকবির প্রস্থানের পর, এবং একষট্টিতে জন্মশতবর্ষ উদযাপনের পর রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে যে সাংস্কৃতিক জোয়ার এসেছিলো, তা এখন অস্তমিত। সাধারণ বাঙালি ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া এবং কনভার্সেশন — তার মধ্যে রবীন্দ্রনাথ যেমন অনুপস্থিত, তেমনই বাংলা ভাষাও অনুপস্থিত। বাংলা ভাষা, বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি, হাজার রকমের বাঙালি জীবনযাত্রার রঙিন ছবি মুছে যাচ্ছে। শুধু রবীন্দ্রনাথ নয়, বাঙালিত্ব মুছে যাচ্ছে খুব দ্রুত।

এক নিম্নশ্রেণীর, বা বলা যায় মগজবিহীন সংস্কৃতি গ্রাস করেছে সমাজকে, যার ভাষা বলিউডি হিন্দি, বা জগাখিচুড়ি সস্তা আমেরিকানি ইংরিজি।

এই নতুন কালচারাল সুনামি হিরোশিমা ও নাগাসাকির মতো কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গকে — সেখানকার ইয়ং জেনারেশনকে — শারীরিকভাবে হত্যা করছেনা, কিন্তু মানসিকভাবে করছে। এক সর্বগ্রাসী কিন্তু একেবারে সাইলেন্ট একটা ভয়াবহ রোগ, ঠিক যেমন সেই গুপী গায়েন ছবিতে শুন্ডীর রাজ্যজোড়া মানুষ কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছিলো, ঠিক তেমনি এখন চিন্তাভাবনা করার, বিচার বিশ্লেষণ করার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। কিন্তু, তফাৎ হলো, শুন্ডীর লোকেরা সে অভাবটা বুঝতো, আর কথা বলার শক্তি ফিরে পাবার আশায় দিন গুনছিল। এখন, যে জেনারেশন গড়ে উঠছে, তারা সে অভাবটাই আর অনুভব করেনা।

বাংলা ভাষাই যদি পশ্চিমবঙ্গ, কলকাতা, ভারত থেকে হারিয়ে যায়, আর তার জায়গা পাকাপাকিভাবে নিয়ে নেয় এক খিচুড়ি ভাষা, খিচুড়ি কালচার — যার অনেকটাই বলিউড, কিছুটা নিম্নশ্রেণীর হিন্দি (উচ্চস্তরের হিন্দি ভাষা ও সাহিত্য সেখানে অনুপস্থিত), কিছুটা নিম্নস্তরের আমেরিকান ইংরিজি, কিছু বাজে হলিউড, আর কিছুটা সামাজিক কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা, ঘৃণা, বিদ্বেষ ও দোষারোপ — সেখানে রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর নন্দিনী যে রক্তকরবী ফোটাতে ব্যর্থ হবেন, তাতে আর আশ্চর্য কী?

মহাকবি ডাক দিয়েছিলেন অন্ধকারের দরজা খোলার। আমরা সেই ডাকে সাড়া দিয়েছিলাম। তার ঐশ্বরিক আলোর স্পর্শ পেয়ে ধন্য হয়েছিলাম। এখন সব খোলা দরজা আবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সিধু জ্যাঠার মনে বাইরের আলো ও বাতাস আজ আর আসেনা।

“পিছনে ঝরিছে ঝরোঝরো জল, গুরুগুরু দেয়া ডাকে
মুখে এসে পড়ে অরুণকিরণ ছিন্ন মেঘের ফাঁকে।”

এই সামান্য কথার অর্থ বোঝার ক্ষমতা আজ আর “আধুনিক,” “শিক্ষিত,” “ইন্ডিয়ান” বাঙালির নেই।

Relevant references:

Umar, Badruddin (2004). The Emergence of Bangladesh: Class Struggles in East Pakistan (1947–1958). Oxford University Press. ISBN 0-19-579571-7.
“International Mother Language Day – Background and Adoption of the Resolution” <https://web.archive.org/web/20070520205804/http://www.pmo.gov.bd/21february/imld_back.htm>. Government of Bangladesh. Archived from the original <http://www.pmo.gov.bd/21february/imld_back.htm> on 20 May 2007. Retrieved2007-06-21.
https://www.smithsonianmag.com/history/genocide-us-cant-remember-bangladesh-cant-forget-180961490/ <https://www.smithsonianmag.com/history/genocide-us-cant-remember-bangladesh-cant-forget-180961490/>
https://www.theguardian.com/commentisfree/2011/may/07/rabindranath-tagore-why-was-he-neglected <https://www.theguardian.com/commentisfree/2011/may/07/rabindranath-tagore-why-was-he-neglected>
https://www.globalpolicy.org/component/content/article/162/27553.html <https://www.globalpolicy.org/component/content/article/162/27553.html>
http://zeenews.india.com/entertainment/bollywood/bollywood-polluting-indian-culture-by-degrading-women-victor-banerjee_129279.html <http://zeenews.india.com/entertainment/bollywood/bollywood-polluting-indian-culture-by-degrading-women-victor-banerjee_129279.html>