আবরার ফাহাদ হত্যা — দুই দেশে নতুন ঘৃণা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি বন্ধ করুন

0
534

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শেরেবাংলা হলে বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যার ঘটনায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে আটকদের মধ্যে অনেকেই ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত। ভারতের সঙ্গে চুক্তির বিরোধিতা করে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন ফাহাদ। এর জের ধরে শেরেবাংলা হলের নিজের কক্ষ থেকে তাকে ডেকে নিয়ে বেধড়ক পেটানো হয়। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

আবরারের হত্যা নিয়ে বাংলাদেশে ঝড় বয়ে যাচ্ছে, এবং আমরা দূর থেকে তার আসন্ন পরিণতি দেখে ভয়ে শিউরে উঠছি।

ধর্মান্ধ, উগ্রপন্থী, ফ্যাসিস্ট ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি এই ঘটনায় নতুন করে অক্সিজেন পেলো, একথা বলে দেওয়ার অপেক্ষা রাখেনা। এর বিশ্লেষণ করা আজ জরুরি।

একজন মানবাধিকার কর্মী হিসেবে আমি আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে তীব্র ধিক্কার জানাচ্ছি, এবং সমস্ত পাঠক, পাঠিকা ও বন্ধুদের আহ্বান জানাচ্ছি তাঁরা যেন এই ঘটনার বিরুদ্ধে সোচ্চার হন।

সবাই জানে আমার বাংলাদেশ প্রীতি। বাংলাদেশের সমর্থনে আমি চিরকাল কথা বলে আসছি, এবং ভবিষ্যতেও বলে যাবো। ভারতের হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্টরা চাইছে বাংলাদেশ যেন দুর্বল হয়ে পড়ে। তারা হিন্দু-মুসলিম ঘৃণা ও বিভেদের আগুন ছড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসতে চায়। ইতিহাসের চাকা ঘুরিয়ে দিতে চায়। বাংলাদেশেও তাদের মিত্রশক্তি আছে — যারা বাংলাদেশের সম্পর্কে প্রতিনিয়ত বিদেশে কুৎসা রটায়। আর আছে রাজাকারবাহিনী ও তাদের প্রকাশ্য ও গোপন নানা শক্তি — যারা সুযোগ খুঁজছে বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার। এই হত্যাকান্ড তাদের হাতে নতুন অস্ত্র তুলে দিয়েছে।

আবরার ফাহাদ মেধাবী ছাত্র ছিল। সে ভারতের সঙ্গে চুক্তির বিরোধিতা করেছিল। তার জন্যে তার বাক-স্বাধীনতা এবং প্রাণ কেড়ে নিলো — ভেবে দেখুন — শেখ মুজিবের জন্মশতবর্ষ পালনের ঠিক একটু আগেই, তাঁরই হাতে গড়া আওয়ামী লীগের ছাত্রলীগ। আসলে, দীর্ঘদিন ধরে বিরোধীশূণ্য রাজনীতির সুযোগ নিয়ে মাফিয়া রাজনীতি বাংলাদেশে জাঁকিয়ে বসেছে। যে কোনো গণতন্ত্রে যদি বিরোধিতা না থাকে, তাহলে তা ক্রমে ক্রমে ফ্যাসিবাদে রূপান্তরিত হয়।

ভারতে এখন বিজেপি ও হিন্দুত্ববাদী আরএসএস রাজনীতির বিরোধিতা করার জন্যে সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতন বেড়ে চলেছে। এমনকি, যা কখনো স্বপ্নেও ভাবা যায়নি, বিখ্যাত বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ, শিল্পী ও কবিদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা আনা হয়েছে। ঠিক যেভাবে হিটলার ও মুসোলিনি ক্ষমতায় এসেছিলো, বা আজকের পৃথিবীতে ট্রাম্প বা বরিস জনসন অথবা ব্রাজিলের বলসেনারো যা করতে চায়, ভারতে তা শুরু হয়ে গেছে।

প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশও কি সেই পথেই যাবে?

আমার সতীর্থ অভিজিৎ রায়ের খুনের পর আরএসএস ও বিজেপি জলঘোলা করার চেষ্টা করেছিল। অভিজিৎ খুন হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ইসলামি জঙ্গিদের হাতে। এখন আবরার ফাহাদ খুন হলো তথাকথিত লিবারাল আওয়ামী লীগের ছাত্র ফ্রন্টের হাতে। এই সমস্ত ঘটনাতেই একদিকে হিন্দু ও ইসলামী মৌলবাদীরা, আর অন্যদিকে বিজেপি ও বিএনপির মতো প্রতিক্রিয়াশীল ও চরম দক্ষিণপন্থী শক্তি — যারা হিন্দু ও ইসলাম ধর্মকে রাজনীতির কাজে ব্যবহার করে ক্ষমতায় এসেছে ও আসতে চায়, তারা আরো শক্তিশালী হবে। এবং বাংলায় ফ্যাসিবাদ ঘাঁটি গেড়ে বসবে।

**যে দাবানলের মতো ভারতবিদ্বেষী আগুন জ্বলে উঠেছে আবরার হত্যার পরে, শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকার যদি প্রকৃত খোলামনে তার মোকাবিলা না করেন, এবং এইসব খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা না করেন, তাহলে পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাবে। **

ভারতের ফ্যাসিস্ট ও ধর্মান্ধরা সুযোগ খুঁজছে বাংলাকে দখল করবার। তসলিমা নাসরীন ও তাঁর বই “লজ্জা”কে নিয়েও তারা রাজনীতি করেছে। বাংলাদেশ থেকে আসা ইমিগ্রেন্ট ও শরণার্থী নিয়ে তারা রাজনীতির খেলা খেলছে, এবং ভবিষ্যতে নাগরিকপঞ্জী এনআরসি (NRC)’র প্যাঁচে মুসলমানদের ফেলে তারা বাংলায় ভোট রাজনীতি করবে, একথা এখন আমরা সবাই জানি। বাংলাদেশ এখন বিজেপির হাতের তুরুপের তাস, ঠিক যেমন কাশ্মীরকে এবং ঝাঁকিয়ে তোলা উগ্র দেশপ্রেমকে তুরুপের তাস হিসেবে কাজে লাগিয়ে তারা লোকসভা নির্বাচনে জিতেছে।

যাদের হাতে দেশের অর্থনীতি বিপর্যস্ত, সাধারণ মানুষ বিপন্ন, জলবায়ু বিপন্ন, নারীস্বাধীনতা বিপন্ন, সংখ্যালঘুদের অধিকার ভুলুন্ঠিত — মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্যে কাশ্মীর, বাংলাদেশ, গোমাংস, রামমন্দির — এসবই তাদের একমাত্র মূলধন। তারা সে ক্যাপিটাল কাজে লাগাবেই। গোয়েবলস মিডিয়াও তাদের সঙ্গে আছে। যারা প্রতিনিয়ত শাসকের স্বপক্ষে প্রোপাগাণ্ডা চালিয়ে যাচ্ছে।

তারা চায়, আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ডের সুযোগে ক্যাম্পাস ছাত্র রাজনীতি যেন বন্ধ করে দেওয়া যায়। তারা ভাষা আন্দোলন বা মুক্তিযুদ্ধে ছাত্র রাজনীতির ভূমিকা অস্বীকার করতে চায়, এবং মানুষের মন থেকে মুছে ফেলতে চায়। তাদের পিছনে আছে কিছু তথাকথিত পাকিস্তানপন্থী, জামাতের সাথে গা শোঁকাশুঁকি করা বুদ্ধিজীবী। তারা ইতিহাসের বিকৃতকরণ করবে। ঠিক যেমন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিজেপি ও তার সমর্থক মিডিয়া দাবি তুলেছে, যাদবপুরে ছাত্র রাজনীতিকে গলা টিপে মারতেই হবে।

যে কোনো বিরোধিতাকে শেষ করে দিতেই হবে।

দুই দেশে একই খেলা। আবার বলছি, ঠিক এইভাবেই হিটলার ও মুসোলিনি ক্ষমতায় এসেছিলো। ফ্যাসিবাদ ও নাৎসিবাদ কায়েম হয়েছিল। ত্রাসের রাজত্ব বয়ে গিয়েছিলো। সারা পৃথিবীতে লক্ষ লক্ষ নিরীহ মানুষের রক্ত ঝরেছিল। আবার সেই ঘটনা ঘটতে চলেছে।

যদি আপনারা এই অশুভ শক্তিগুলোকে প্রতিহত করতে চান, তাহলে দলমতনির্বিশেষে এইসব খুন ও স্বাধীন মতপ্রকাশের কণ্ঠরোধ করার হিংস্র রাজনীতির তীব্র প্রতিবাদ করুন। পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের মানুষকে বুঝতে হবে, ফ্যাসিবাদ ও ধর্মান্ধতার আসল লক্ষ্য হলো বাঙালি জাতিকে, এবং তার ভাষা, ইতিহাস, সংগীত, কাব্য, সংস্কৃতিকে চিরতরে ধ্বংস করে ফেলা। এবং অর্থ, সমাজ ও ক্ষমতার নিরঙ্কুশ দখল।

আজকে ফ্যাসিবাদ ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ আমাদের দুই বাংলার মানুষের কাছে এক নতুন মুক্তিযুদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত হোক, এই আমার প্রার্থনা।

সবাইকে বিজয়া দশমীর শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা জানাই।

Join the Conversation

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.